Anxiety and sleep problems
আজকের ব্যস্ত ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ জীবনে অ্যানজাইটি (Anxiety) বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং ঘুমের সমস্যা (Sleep Disorders) খুব সাধারণ একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় আমরা একে সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাই, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অ্যানজাইটি এবং অনিদ্রা মানুষের শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দুটি সমস্যা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—অতিরিক্ত অ্যানজাইটির কারণে যেমন ঘুম উধাও হয়ে যায়, ঠিক তেমনি দিনের পর দিন পর্যাপ্ত না ঘুমালে মানুষের মনে অ্যানজাইটি বা প্যানিক অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
অ্যানজাইটি ও ঘুমের সমস্যার প্রধান লক্ষণসমূহ
অনেকেই বুঝতে পারেন না তারা কখন সাধারণ দুশ্চিন্তা থেকে ‘অ্যানজাইটি ডিজঅর্ডার’-এর দিকে ধাবিত হচ্ছেন। নিচে এর প্রধান লক্ষণগুলো দেওয়া হলো:
ক. অ্যানজাইটি বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার লক্ষণ:
- ভবিষ্যৎ বা যেকোনো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সারাক্ষণ মনের ভেতর অহেতুক ভয় বা টেনশন কাজ করা।
- বুকের ভেতর ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা বা অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।
- যেকোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে চরম অসুবিধা হওয়া।
- সবসময় অস্থির লাগা এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া।
- প্যানিক অ্যাটাক (হঠাৎ করে তীব্র দমবন্ধ ভাব বা হার্ট অ্যাটাকের মতো ভয় হওয়া)।
খ. ঘুমের সমস্যার (ইনসোমনিয়া) লক্ষণ:
- বিছানায় যাওয়ার পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়া, কিন্তু ঘুম না আসা।
- মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং এরপর আর কোনোভাবেই ঘুমোতে না পারা।
- সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও শরীর ও মনে ক্লান্তি থেকে যাওয়া (অশান্তিদায়ক ঘুম)।
- অল্পতেই ঝিমুনি আসা এবং সারা দিন ক্লান্তি বোধ করা।
অ্যানজাইটি কীভাবে ঘুম কেড়ে নেয়? (The Vicious Cycle)
আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা অ্যানজাইটিতে ভুগি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক শরীরকে একটি ‘বিপদ সংকেত’ পাঠায়। এর ফলে শরীরে কর্টিসল (Cortisol) ও অ্যাড্রেনালিন (Adrenaline) নামক স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়।
এই হরমোনগুলো আমাদের শরীরকে হাইপার-অ্যালার্ট বা সদা সতর্ক করে তোলে। ফলে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় এবং মস্তিষ্ক শান্ত হতে পারে না। প্রাকৃতিকভাবে ঘুমানোর জন্য আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের যে শিথিলতা (Relaxation) প্রয়োজন, অ্যানজাইটি তা পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত করে।
অ্যানজাইটি ও ঘুমের সমস্যা থেকে মুক্তির উপায়
সঠিক সচেতনতা এবং লাইফস্টাইলে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই চক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব।
১. ‘স্লিপ হাইজিন’ (Sleep Hygiene) মেনে চলুন
- নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখুন: প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন (এমনকি ছুটির দিনেও)।
- ক্যাফেইন বর্জন: বিকেল ৪টার পর চা, কফি বা যেকোনো সফট ড্রিঙ্কস খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। ক্যাফেইন মস্তিষ্কের স্নায়ুকে উত্তেজিত রাখে।
- মেডিকেল স্ক্রিন অফ: ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টেলিভিশন বন্ধ করে দিন। স্ক্রিনের নীল আলো (Blue Light) ঘুমানোর হরমোন ‘মেলাটোনিন’ তৈরিতে বাধা দেয়।
২. মনকে শান্ত করার অভ্যাস (Relaxation Techniques)
- দীপ ব্রিথিং (Deep Breathing): বিছানায় শুয়ে ৪ সেকেন্ড বুক ভরে শ্বাস নিন, ৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন এবং ৬ সেকেন্ড ধরে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এটি আপনার শরীরের স্ট্রেস রেসপন্সকে তাৎক্ষণিক কমিয়ে দেয়।
- চিন্তার ডায়েরি (Worry Journal): ঘুমানোর আগে মনের সব দুশ্চিন্তা বা আগামীকালের কাজগুলো একটি ডায়েরিতে লিখে ফেলুন। এতে মস্তিষ্ক হালকা হয় এবং ঘুম দ্রুত আসে।
৩. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম
- দিনে অন্তত ২০-৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি, যোগব্যায়াম বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন। শারীরিক ক্লান্তি গভীর ঘুমে অত্যন্ত সহায়ক। তবে ঘুমানোর ঠিক আগমুহূর্তে ভারী ব্যায়াম করবেন না।
কখন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?
যদি লাইফস্টাইল পরিবর্তনের পরও আপনার অ্যানজাইটি ও ঘুমের সমস্যা টানা ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় এবং তা আপনার চাকরি, পড়াশোনা বা পারিবারিক জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে, তবে অবহেলা না করে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist) বা কাউন্সেলর-এর শরণাপন্ন হওয়া উচিত.
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই সমস্যার জন্য দুটি চমৎকার সমাধান দিয়ে থাকেন:
- CBT-I (Cognitive Behavioral Therapy for Insomnia): কোনো প্রকার ওষুধ ছাড়াই কথা বলা ও থেরাপির মাধ্যমে ঘুমের সমস্যা দূর করার একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
- নিরাপদ চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং: প্রয়োজনভেদে চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শে সাময়িক কিছু ওষুধ বা থেরাপির মাধ্যমে অ্যানজাইটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব.
শেষ কথা:
ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের বেঁচে থাকার এবং সুস্থ থাকার জ্বালানি। মনের ভেতরের অস্থিরতা লুকিয়ে না রেখে তা প্রকাশ করুন এবং প্রয়োজনে সঠিক সময়ে পেশাদার চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করুন।

